দুর্নীতি ও এর প্রতিকার রচনা (১০০০ শব্দ) | SSC |


বাংলাদেশের দুর্নীতি ও এর প্রতিকার রচনার সংকেত

  • ভূমিকা
  • দুনীতি কী
  • দুর্নীতির প্রভাব
  • বাংলাদেশের দুর্নীতির স্বরূপ
  • স্বাস্থ্যখাতে
  • পরিবহন খাতে
  • অন্যান্য খাতে
  • দুর্নীতির প্রতিকার ও প্রতিরােধ
  • উপসংহার

বাংলাদেশের দুর্নীতি ও এর প্রতিকার রচনা

“সমাজ জীবনে দুর্নীতি” দুর্নীতি ও সমাজ “দুর্নীতি ও অপচয়” বাংলাদেশের দুর্নীতি: কারণ ও প্রতিকার “বাংলাদেশের দুর্নীতি ও এর প্রতিকার

ভূমিকা:

একটি সমাজের সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাধি হলাে দুর্নীতি। বর্তমান পৃথিবীতে দুর্নীতিকে একটি সামাজিক সংকট ও জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরেই আজ দুর্নীতি ধরা পড়ছে। যেকোনাে সমাজকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে দুনীতির কোনাে জুড়ি নেই। ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে মিরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের স্বাধীনতাকে ভূলুণ্ঠিত করেছিল। কিন্তু ১৯৭১ সালে আমরা রক্ত ​​দিয়ে সেই স্বাধীনতাকে অর্জন করেছি। তবে এই সমস্ত অর্জনকে আজ নস্যাৎ করে দিচ্ছে আমাদেরই গড়া দুর্নীতির পাহাড়। তাই স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও আজ আমরা সামাজিক সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছি।

দুর্নীতি কী:

সাধারণভাবে দুর্নীতি বলতে যেকোনাে নীতিবিরুদ্ধ কাজকে বােঝানাে হয়। মানুষ যখন বিবেকের তাড়না, স্ততা, ন্যায়-নীতি, আদর্শ ও মূল্যবােধকে বিসর্জন দিয়ে ব্যক্তি বা গােষ্ঠীস্বার্থ হাসিল করার জন্য আইনকে অমান্য করে কোনাে কাজ করে তখন তাকে দুনীতি বলা হয়। এক প্রশ্নের জবাবে বিশ্বব্যাংক বলেছে ব্যক্তিগত লাভ ও গােষ্ঠীর স্বার্থের জন্য সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করাই। লাে দুর্নীতি। অন্যভাবে বলা যায় দুর্নীতি হলাে এমন একটি প্রক্রিয়া যা দায়িত্বশীল পদে থকা কোনাে মানুষকে নিজ দায়িত্ব পালনে মানসিকভাবে বাধা প্রদান করে।

দুর্নীতির প্রভাব:

দুর্নীতির প্রভাব ব্যাপক ও সুদূর প্রসারী। এটি প্রত্যক্ষ করতে খুব বেশি কষ্ট করতে হয় না। বাংলাদেশের দুর্নীতি জাতীয় একটি সমস্যা। দুর্নীতির কারণে সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের সুবিধাবঞ্চিত, দরিদ্র ও ক্ষমতাবলয়ের বাইরের জনগােষ্ঠী। দুনীতি উন্নয়নকে ব্যাহত করে এবং মানুষের মৌলিক অধিকারকে হরণ করে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলাে দুর্নীতি। দুর্নীতি সমাজে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধি করে; গণতান্ত্রিক মূল্যবােধ ও গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দুর্নীতি। দুর্নীতি সমাজে একটি অপরাধভিত্তিক সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠিত করে। দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও সার্বভৌমত্বকে দুর্নীতি হুমকির সম্মুখীন করে।

বাংলাদেশের দুর্নীতির স্বরূপ:

বর্তমানে দেশের শাসনযন্ত্রের প্রায় সকল স্তরেই দুনীতি চলছে। সরকারি নানা খাত যেমন— পুলিশ বিভাগ, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস সরবরাহ, শিক্ষা, বর্জ্য অপসারণ, স্বাস্থ্য, পরিবহন, প্রশাসন ইত্যাদি প্রায় সকল স্তরেই রয়েছে দুর্নীতি।

স্বাস্থ্যখাতে:

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ২০১২ সালে এক জরিপে দেখিয়েছে সরকারি হাসপাতালে ৪০.২% রােগী দুর্নীতি ও অনিয়মের শিকার হয়। এসব হাসপাতালের ডাক্তার ও নার্সরা সরকারি হাসপাতালের চেয়ে বেসরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন হাসপাতালে বেশি সময় দিচ্ছেন। ফলে দরিদ্র ও অসহায় রােগীরা চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। শিক্ষাখাতে সরকারি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা ও গবেষণার জন্যে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হয় তার একটি বড়াে অংশই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের হস্তগত। অন্যদিকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মােটা অঙ্কের টাকা নেয়া হচ্ছে কিন্তু সে অনুযায়ী উন্নত শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে না। প্রশাসনিক খাতে সরকারি প্রশাসনের প্রতিটি স্তরেই রয়েছে দুর্নীতি। সরকারি বিভিন্ন কাজে হচ্ছে ঘুষের অনিয়ন্ত্রিত লেনদেন। আমলাতন্ত্র এখন ব্যাপকভাবে দুর্নীতিতে আচ্ছন্ন।

পরিবহন খাতে:

পরিবহন খাতেও দুর্নীতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ঠিকাদারেরা রাস্তাঘাট নির্মাণের জন্যে যে পরিমাণ বরাদ্দ পায় তার খুব সামান্যই ব্যয় করে। ফলে নিম্নমানের রাস্তাঘাট তৈরি হচ্ছে। এছাড়া ফিটনেসবিহীন গাড়ির আধিক্যের কারণে প্রতি বছর দুর্ঘটনায় প্রচুর লােকজন মারা যাচ্ছে ।।

অন্যান্য খাতে:

দুর্নীতির আরও অনেক খাত রয়েছে। যেমন— সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্যে রাজনৈতিক দলগুলাের ছাত্র সংগঠন সর্বদা তৎপর। হল দখল, টেন্ডারবাজি তাদের হাতের মুঠোয়। বড় বড় ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার কারণে নানা অনিয়মের মাধ্যমে জনগণের অর্থ আত্মসাৎ করছে। পুলিশসহ অন্যান্য আইন প্রণয়নকারী ও প্রয়ােগকারী সংস্থা অর্থের বিনিময়ে নানা অনিয়ম করে যাচ্ছে।

দুর্নীতির প্রতিকার ও প্রতিরােধ:

আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র তথা জাতিকে সমৃদ্ধশালী করতে প্রথমেই দেশ থেকে দুর্নীতিকে নির্মূল করতে হবে। আর তার জন্যে প্রয়ােজন দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরােধ গড়ে তােলা। এই প্রতিরােধ প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক— এই দুভাবে করা যেতে পারে। যেমন—

ক. প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরােধ: প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরােধ দুই রকমের হতে পারে-
১. দুদক: বাংলাদেশ সরকার দেশ থেকে দুর্নীতিকে নির্মূল করতে ২০০৪ সালে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গঠন করেছে। দুদক বর্তমানে সফলভাবে পরিচালিত হলেও এটিকে আরও শক্তিশালীরূপে গড়ে তুলতে হবে। তাহলে আমাদের দেশ থেকে দুর্নীতিকে পুরােপুরি দূর করা সম্ভব হবে।
২. TIB: ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ, দলীয় রাজনীতিমুক্ত ও অলাভজনক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিশ্ব আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে টিআইবি বার্লিনভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) -এর বাংলাদেশ চ্যাপ্টার হিসেবে স্বীকৃত। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি বছর দুর্নীতির ধারণা সূচক প্রকাশ করে থাকে যার মাধ্যমে একটি দেশের দুর্নীতির মাত্রা প্রকাশ পায়। বাংলাদেশের দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরার ফলে এ ক্ষেত্রে সরকার সতর্ক থাকতে পারে।

খ. অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরােধ: শুধু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে একটি দেশের দুর্নীতি সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় সর্বক্ষেত্রে প্রতিরােধ গড়ে তুলতে পারলে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গঠন করা সম্ভব হবে।

১. ব্যক্তির নৈতিক মূল্যবােধ: দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়তে প্রথমেই প্রয়ােজন ব্যক্তির নৈতিক মূল্যবােধের বিকাশ। প্রতিটি ব্যক্তির মধ্যে নৈতিক মূল্যবােধ সৃষ্টি করতে পারলে সমাজে দুর্নীতির মাত্রা উল্লেখযােগ্য মাত্রায় কমে আসবে।

২. সামাজিক প্রতিরােধ: দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হলে আমাদের সমাজকেই দায়িত্ব নিতে হবে। কেননা সামাজিক ঐক্যই পারে এই ব্যাধি থেকে দেশকে মুক্ত করতে। সমাজে যদি দুর্নীতিবাজকে ঘৃণা করা হয় এবং তাদের সঙ্গে দূরত্ব রেখে চলা হয় তবে দুর্নীতি অনেকাংশে নির্মূল করা যাবে।

৩. ধর্মীয় মূল্যবােধের বিকাশ: সমাজে দুর্নীতির মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ ধর্মীয় মূল্যবােধের অভাব। সমাজে ধর্মীয় মূল্যবােধের বিকাশ ঘটাতে পারলে এ সমস্যার সমাধান খুব সহজেই সম্ভব হবে। প্রতিটি মসজিদে, মন্দিরে, গির্জায় দুর্নীতির ধর্মীয় কুফল সম্পর্কে আলােচনা করলে মানুষের মনে ভীতির সৃষ্টি করবে।

৪. সামাজিক যােগাযােগ মাধ্যম ও মিডিয়া: দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে সামাজিক যােগাযােগ মাধ্যম যেমন— ফেসবুক, টুইটার, ভাইবার ইত্যাদির মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। এছাড়া ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে দুনীতিমুক্ত সমাজের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রচারণা চালাতে হবে। তাহলে এটা একটি সামাজিক আন্দোলনের রূপলাভ
করবে।

৫. আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা: দুর্নীতিবিরােধী অভিযানে আইনের শাসন খুব তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দুর্নীতিকে একটি কঠোর শাস্তিযােগ্য অপরাধ হিসেবে জনগণের সামনে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে আইনকে তার আপন গতিতে চলতে দিতে হবে এবং প্রমাণ করতে হবে কেউ আইনের উর্ধ্বে নয় বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা ছাড়া কোনাে আইনের সর্বোত্তম প্রয়ােগ কোনােভাবেই সম্ভব হবে না। এক্ষেত্রে দুর্নীতিবিরােধী অভিযানের গ্রহণযােগ্যতাকে কোনােভাবেই বিনষ্ট করা যাবে না।

৬. প্রশাসনে সংস্কার: স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও যােগ্যতাসম্পন্ন প্রশাসনিক খাত যেকোনাে দেশের দুর্নীতি প্রতিরােধে তাৎপর্যপূর্ণ। ভূমিকা পালন করে থাকে। পৃথিবীর যে সমস্ত দেশ সাফল্যের সঙ্গে দুর্নীতিকে প্রতিহত করতে পেরেছে তাদের কর্মপন্থায় প্রশাসন খুবই দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের দুর্নীতি বিস্তারের বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দুই ধরনের মৌলিক কারণ দৃষ্টিগােচর হয়— ১. প্রয়ােজনতাড়িত দুর্নীতি ২. লােভতাড়িত দুর্নীতি। এই দুটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে দুর্নীতির খাতগুলোকে সরাসরি আইনের আওতায় আনতে হবে এবং আইনি প্রক্রিয়ায় যথাযথ শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে।

উপসংহার:

বাংলাদেশের মতাে দ্রুত উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখা দেশে দুর্নীতি সুকৌশলে দানা বেঁধে উঠতে পারে। তাই এটি সম্পর্কে প্রথমে সাধারণ মানুষকে অবগত করা প্রয়ােজন। কারণ জনগণ দুর্নীতি সম্পর্কে যত সচেতন হবে ততই অসাধু ব্যক্তিরা দুর্নীতি করতে ভয় পাবে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানকে আন্তরিকভাবে দুনীতি দমনে এগিয়ে আসতে হবে। তবেই সামগ্রিক সমাজ থেকে দুর্নীতিকে বিদায় করা সম্ভব হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *